সত্য ইতিহাস সংরক্ষণেই ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এটি বিভাজনের নয়, বরং ঐকমত্যেরর ভিত্তিতে ইতিহাস সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ সময়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীনতার এত বছর পর এসে ইতিহাস নিয়ে বিভক্তি তৈরি হওয়া উদ্বেগজনক। তারা মনে করেন, সদ্য সংগঠিত জুলাই আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে যুক্ত করে দেশ সংস্কার ও গঠনের নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করা যেত। এতে ব্যক্তি বা পক্ষভিত্তিক প্রাধান্যের বিতর্কের বদলে রাষ্ট্রগঠনের মূল প্রশ্ন সামনে আসত।
মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষকদের মতে, এখনই সময় নিরপেক্ষ ও নির্মোহ গবেষণার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের। কারণ মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের বড় একটি অংশ আর বেঁচে নেই, আর যারা আছেন তাদের অনেকের পক্ষেই বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। এ ছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্ভরযোগ্য উৎসও দুর্লভ হয়ে উঠছে। যাদের নিরপেক্ষ গবেষক হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তাদের অনেকেই আর জীবিত নেই। ফলে অতীতের বিকৃত তথ্য সংশোধন করে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
এ সময়ের ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে তারা বলেন, যদি বর্তমান সরকারও অতীতের ধারাবাহিকতায় ইতিহাস বিকৃতির পথে হাঁটে, তবে তা জাতির জন্য বড় দুর্ভাগ্য ডেকে আনবে। তাদের মতে, এটি হবে জাতির ইতিহাসের জন্য এক গভীরতম আঘাত।
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় দুই নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক আলো বলেন, তিনি ২৫ মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। স্থানীয়ভাবে প্রায় ২০০ জনের একটি দল গঠন করলেও এক রাজাকারের বিশ্বাসঘাতকতায় তা ব্যর্থ হয়। পরে আগরতলায় প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি নিজ এলাকায় যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রাখেন।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সাম্প্রতিক আন্দোলনেও অংশ নিয়েছি। কিন্তু তাই বলে ইতিহাসকে বিভক্ত করা যাবে না। এখনই সময় সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করে তা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মেজবাহ উল ইসলামও তার সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রথমত আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষকের অভাব আছে। তার ওপরে গহণযোগ্য যৎসামান্য যারা এই গবেষণায় ছিলেন—বদরুদ্দিন ওমর, মেজর (অব.) কামরুল হাসান ভূঁইয়া, শামসুল হুদা চৌধুরী, মুনতাসির মামুন এবং ড. এম এ হাসান, তারা হয় মারা গেছেন নতুবা জীবন মরণের সন্ধিক্ষণে আছেন। এর মধ্যে যদি আবার রাজনৈতিক চাপ থাকে তবে গবেষনার কিচ্ছুই হবে না। নিজেদের অস্তিত্বের জন্য, তা নিয়ে নুন্যতম ঐকমত্য গড়ে, নিজেদের ইতিহাস যথযথ সংরক্ষণ করতে নির্মোহ, নিরপেক্ষ গবেষণার দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘গবেষণার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে নিরপেক্ষ ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। তাই ন্যূনতম ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ গবেষণা নিশ্চিত করা জরুরি।’
মুক্তিযোদ্ধা গবেষক ড. এম এ হাসানের মতে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও সাম্প্রতিক আন্দোলন—দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট হলেও উভয়ই জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘এগুলোকে বিরোধ নয়, বরং ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে একাত্তরকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে এবং সঠিক তথ্য তুলে নিয়ে আসতে তরুণদের সম্পৃক্ত করা একান্ত দরকার। দরকার আওয়ামী লীগ আমলে যে বিকৃত করা হয়েছিল তা সংশোধন করে এক নিরপেক্ষ, নির্মোহ ইতিহাস তুলে ধরা। যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তালিকা সংশোধন করে তুলনামূলক সঠিক তালিকা তৈরি করে, সঠিক তথ্য সঠিক স্থানে সংকুলান করে সবাইকে জানার ব্যবস্থা করা।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান জানান, সরকার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে গবেষণাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এ বছরের জন্য ইতোমধ্যে গবেষণা অনুদান ঘোষণা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গবেষণার বিষয় ও পরিসরের ভিত্তিতে একজন গবেষক বা গবেষণাদলকে পাঁচ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পিএইচডি গবেষকসহ অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৪ মার্চ এসংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা জারি করেছে। মোট তিনটি ক্যাটাগরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, স্বীকৃত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, একক ব্যক্তি, পিএইচডি গবেষক বা অভিজ্ঞ গবেষকেরা এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন। প্রতিবছর গবেষণার জন্য এই অনুদান দেওয়া হবে। তবে প্রতিবছর তিন ক্যাটাগরিতে কতজনকে অনুদান দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
উপসচিব (উন্নয়ন) আলমগীর হোসেন বলেন, বাজেট অনুযায়ী প্রতিবছর অনুদানের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান নিয়েও গবেষণার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো আব্দুস সালাম বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আপস বা দয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়নি; এটি এসেছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।
তিনি আরও বলেন, ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার পথ তৈরি হয়। ২৫ মার্চের গণহত্যা সেই সংগ্রামকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরা জরুরি।
স্বাধীনতা দিবসে ফিরেছে ঐতিহ্যবাহী কুচকাওয়াজ
এদিকে দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর আবারও ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কুচকাওয়াজ। এতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী অংশ নিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন অনুষ্ঠানে সালাম গ্রহণ করেন এবং প্রধানমন্ত্রীও উপস্থিত রয়েছেন। প্যারেডে স্থল ও আকাশপথে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি প্যারাট্রুপারদের অংশগ্রহণ ও মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের ফ্লাইপাস্ট রয়েছে।
সকাল ৯টায় শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। প্রবেশ গেট ২, ৩, ৪, ১০ ও ১১ সর্বসাধারণ প্রবেশ করেতে পারবেন, তবে দর্শনার্থীদের ব্যাগ বহন না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে আইএসপিআর।
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে হবে স্মৃতি জাদুঘর, থাকবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
অন্যদিকে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রকে ঘিরে আধুনিক স্মৃতি জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এখানে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক সম্প্রচার সরঞ্জাম সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট স্মৃতি তুলে ধরা হবে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, ২৫ মার্চের পর দেশের সংকটময় সময়ে এই বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে নতুন করে সাহস জুগিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ‘যে জাতি তার ইতিহাস ভুলে যায়, সে জাতি টিকে থাকতে পারে না। তাই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক স্মৃতি জাদুঘর গড়ে তোলা হবে।’
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও শহীদ জিয়ার স্মৃতিকে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তাই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও জিয়ার স্মৃতি জাদুঘরকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় আনার বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি জানিয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বীরত্বগাঁথা তুলে ধরতে উদ্যোগ জোরদার করা হবে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শহীদ জিয়ার নির্মম হত্যাকাণ্ড যেমন জাতির জন্য বেদনাদায়ক অধ্যায়, তেমনি মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান বাঙালির গৌরবের অংশ। এই দুই ঐতিহাসিক দিক যথাযথভাবে উপস্থাপন ও সংরক্ষণের জন্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে।