প্রতি বছর মে মাসের প্রথম দিনটি এলেই লাল পতাকার মিছিল, গগনবিদারী স্লোগান আর বর্ণাঢ্য র্যালিতে রাজপথ মুখর হয়ে ওঠে। পহেলা মে এখন স্রেফ একটি ক্যালেন্ডারচিহ্নিত ছুটির দিন, এক নিছক আনুষ্ঠানিকতা। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর হে মার্কেটের রক্তভেজা ইতিহাস আজ যেন স্রেফ সভা-সেমিনার আর ড্রয়িংরুমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ। অথচ যে মুক্তি আর অধিকারের লড়াইয়ে রাজপথ রক্তে রাঙা হয়েছিল, শতবর্ষ পরেও সেই মুক্তির সৌভাগ্য শ্রমিকের কপালে জোটেনি। বরং যে আদিম দাস প্রথা নিয়ে সভ্যতা একসময় লজ্জিত ছিল, সেই প্রথাই আজ করপোরেট কালচারের মধ্য দিয়ে অত্যাধুনিক কর্মসংস্থানের নামে হাজির হয়েছে। শ্রমিকের শিকল খোলেনি, কেবল তার ধরন বদলেছে। স্যুট-টাই পরা মালিক আর ডিজিটাল দাসদের সামন্ততান্ত্রিক যুগে প্রবেশ করেছে বিশ্ব।
বিশ্বজুড়ে আজ এক অদ্ভুত বৈষম্যের রাজত্ব। একদিকে বিশ্বের আটশ কোটি মানুষের এক বিশাল অংশ দুবেলা দুমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা পায় না, অন্যদিকে হাতেগোনা কয়েকজন ধনকুবেরের পাতের খাবার উপচে ডাস্টবিনে পড়ে। হাড় জিরজিরে আফ্রিকা-এশিয়ার কোনো শিশু যখন এক মুঠো খাদ্যের জন্য জলভরা চোখে স্রষ্টার পানে তাকিয়ে থাকে, তখন উন্নত বিশ্বের কোনো বিলাসবহুল ভোজসভায় একবেলাতেই উড়িয়ে দেওয়া হয় কোটি কোটি ডলার। এই যে ধনী-দরিদ্রের আসমান-জমিন ফারাক, এটি কোনো দৈব ঘটনা নয়; বরং এটি মালিকপক্ষের পরিকল্পিত শোষণের এক আধুনিক সংস্করণ। মালিকের শোষণ কমেনি, বরং প্রযুক্তির আড়ালে তা আরও নিষ্ঠুর হয়েছে। এখন শ্রমিককে কেবল শরীর নয়, তার মগজ আর সময়কেও চব্বিশ ঘণ্টার জন্য সঁপে দিতে হয় সভ্য দাসত্বের জোয়ালে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরও ভয়াবহ। আমাদের দেশে উন্নয়নের চাকচিক্য যত বাড়ছে, তার চেয়েও দ্রুতগতিতে বাড়ছে ধনী-দরিদ্রের ফারাক। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে কোটিপতির সংখ্যা এখন এক লাখ ১৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এক দশক আগেও এই সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। প্রশ্ন হলো, মুষ্টিমেয় এই শ্রেণির হাতে যখন দেশের সিংহভাগ সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে, তখন সাধারণ শ্রমিকের পাতে কী জুটছে? সরকারি হিসাবেই দেশে চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য, অথচ নব্য কোটিপতির জন্মের হার আমাদের সব বৈশ্বিক রেকর্ডকে টেক্কা দিচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমপরিবেশ নিয়ে কথা বলা যেন অরণ্যে রোদন। এখানে চাকরির কোনো গ্যারান্টি নেই। মালিকপক্ষ যখন খুশি যেকোনো অজুহাতে কর্মী ছাঁটাই করছে। সকালবেলা কাজে যাওয়া একজন কর্মী জানে না বিকেলের সূর্য ডোবার আগে তার জীবিকা টিকে থাকবে কি না। শ্রম আইন আছে কাগজে-কলমে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন মালিকের পকেটে। গার্মেন্টস সেক্টর থেকে শুরু করে ইনফরমাল সেক্টর, সবখানেই শ্রমিক-কর্মচারীরা আজ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের যাত্রী। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই বাজারে কর্মীদের বেতন বাড়ছে পিঁপড়ার গতিতে, আর নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে রকেটের গতিতে।
আজকের যুগে মে দিবসে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, আমরা এক আধুনিক সামন্ততন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যেখানে দাসের মালিকেরা এখন টাই-স্যুট পরে এসি রুমে বসে থাকেন, আর দাসের দল রোদে পুড়ে ঘাম ঝরিয়ে তাদের মুনাফার পাহাড় গড়ে দেয়। শিকাগোর সেই শ্রমিকরা যে আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার জন্য প্রাণ দিয়েছিল, আজ অনেক ক্ষেত্রে সেই আট ঘণ্টা কেবল কাগুজে নিয়ম। ওভারটাইমের ফাঁদে কিংবা টার্গেট পূরণের চাপে শ্রমিককে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হচ্ছে প্রায় বিনা পারিশ্রমিক বা নামমাত্র মূল্যে।
আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল সাম্য ও মানবিক মর্যাদা। কিন্তু পরিসংখ্যানের নিষ্ঠুর বাস্তবতা বলছে, আমরা সেই পথ থেকে অনেকটাই দূরে সরে এসেছি। স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে আমাদের দেশে আয়ের বৈষম্য পরিমাপক সূচক বা গিনি কোফিশিয়েন্ট ছিল মাত্র ০.৩৬, যা একটি সমতাভিত্তিক সমাজের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আজ সেই সূচক দাঁড়িয়েছে ০.৪৯৯-এ। অর্থনীতিতে ০.৫ সূচককে বলা হয় ‘বিপজ্জনক বৈষম্য’ বা চরম বৈষম্যের রেড জোন। অর্থাৎ আমরা এখন এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামোতে বাস করছি যেখানে উন্নয়নের সুফল চুইয়ে নিচে পড়ছে না, বরং সবটুকু সম্পদ শুষে নিচ্ছে ওপরে বসে থাকা সামান্য কিছু মানুষ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশের সম্পদ বণ্টনের চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক; যেখানে উপরের মাত্র পাঁচ শতাংশ ধনী মানুষের হাতে দেশের মোট আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ কুক্ষিগত হয়ে আছে, সেখানে বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষকে ভাগ করে নিতে হচ্ছে অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ আয়।
এই বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে আবার একদম নিচের তলায় থাকা পাঁচ শতাংশ মানুষের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়, কারণ তাদের ভাগ্যে জুটছে মোট আয়ের এক শতাংশেরও কম, মাত্র ০.৩৭ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় যে, দেশের সিংহভাগ মানুষ জাতীয় আয়ের ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত থাকছেন এবং সম্পদের এই চরম কেন্দ্রীভবন মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও জীবনযাত্রার সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
এই যে পাহাড়সম ব্যবধান, এটিই প্রমাণ করে কেন রাজপথে কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি আর ফুটপাতে অভুক্ত মানুষের সহাবস্থান আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ বলা হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই বাজারে সাধারণ শ্রমিকের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা যে তলানিতে ঠেকেছে, তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।
ভবিষ্যতের পূর্বাভাসও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। বর্তমানে টাকার অবমূল্যায়ন আর পরোক্ষ করের যে বোঝা, তা মূলত দরিদ্র এবং মধ্যবিত্তের পকেটই বেশি কাটছে। অন্যদিকে সম্পদশালীদের জমি, সোনা বা ডলারের মজুত ফুলেফেঁপে উঠছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের চরম অনিশ্চয়তা। শ্রমিকের এখন আর চাকরির গ্যারান্টি নেই, দরকষাকষির শক্তিও নেই। মালিকপক্ষ যখন-তখন ছাঁটাইয়ের খড়্গ ঝুলিয়ে রাখছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা প্রবৃদ্ধির অন্ধ দৌড় থামিয়ে সম্পদের সুষম বণ্টনে মন না দেব, ততক্ষণ এই বৈষম্য বাড়তেই থাকবে। শ্রমিকের মুক্তি আসলে কোনো দান বা দয়া নয়; এটি একটি কাঠামোগত মৌলিক অধিকার। যতক্ষণ মালিকপক্ষ শ্রমিককে স্রেফ উৎপাদনের একটি উপকরণ হিসেবে দেখবে, ততক্ষণ এই সভ্য দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙা সম্ভব হবে না।
যতদিন পর্যন্ত সম্পদের সুষম বণ্টন না হবে, যতদিন পর্যন্ত শ্রমিকের কাজের স্থায়িত্ব নিশ্চিত না হবে, ততদিন মে দিবস কেবলই একটি আনুষ্ঠানিক উৎসব হয়ে থাকবে। আমাদের প্রয়োজন এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে মালিকের প্লেটেও খাবার থাকবে, একইসাথে শ্রমিকের থালাতেও থাকবে ক্ষুধার জ্বালা মেটানোর প্রয়োজনীয় খাবার। তা না হলে এই তথাকথিত সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদিম দাসপ্রথা আমাদের মানবিকতাকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলবে।
পরিবর্তন আসতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে। এই পরিবর্তন রাজনীতির মাধ্যমেই আনতে হবে। এর একমাত্র সমাধান রাজনীতিই। কিন্তু বর্তমানের ব্যবসায়ী-নির্ভর রাজনীতি দিয়ে এই বদল আনা অসম্ভব। যখন আইনপ্রণেতাদের বড় অংশই স্বয়ং মালিকপক্ষ, তখন শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার আইনগুলো কেবল ড্রয়ারেই পড়ে থাকবে। এর জন্য প্রয়োজন এমন এক রাজনীতি যা পুঁজির চেয়ে মানুষকে বেশি গুরুত্ব দেবে। শ্রমিকের মুক্তি কোনো দাতা সংস্থার প্রেসক্রিপশনে আসবে না, আসবে সেই রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের মাধ্যমে যে কাঠামো বৈষম্যকে টিকিয়ে রেখে মুনাফা গোনে।
শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লড়াই কেবল একদিনের সেমিনার বা শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলে বৈষম্যের এই জগদ্দল পাথর সরানো অসম্ভব। বর্তমানের জিডিপি-কেন্দ্রিক যে ‘উন্নয়ন মডেল’ আমাদের সামনে রাখা হচ্ছে, সেখানে সাধারণ শ্রমিকের জন্য আশার আলো খুব সামান্যই; কারণ এই প্রবৃদ্ধি আসলে আমাদের এক কর্মসংস্থানহীন বা ‘জবলেস গ্রোথ’-এর চোরাবালিতে আটকে ফেলছে। আধুনিক প্রযুক্তি আর পুঁজির আগ্রাসনে শ্রমিকের ঘাম আর শ্রম আজ কেবল সস্তা কাঁচামালে পরিণত হয়েছে। এই অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ কেবল তখনই উন্মোচিত হতে পারে, যখন রাষ্ট্র বিদ্যমান ব্যবস্থার খোলস ভেঙে সমন্বিত উন্নয়ন নীতিতে ফিরে আসবে এবং সম্পদের ওপর দেশের প্রতিটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করবে। উন্নয়নকে গুটিকতক ধনীর ড্রয়িংরুম থেকে বের করে নিয়ে এসে যদি সাধারণ ৯৫ শতাংশ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবেই কেবল বৈষম্য হ্রাসের প্রকৃত পথ তৈরি হবে। যেদিন রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত মুষ্টিমেয় কয়েকজনের বদলে সাধারণ মেহনতি মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবে, কেবল সেদিনই রক্তের দামে কেনা ‘মে দিবস’ তার পূর্ণ মর্যাদা ও সার্থকতা খুঁজে পাবে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমালোচক
ইমেইল: [email protected]