মে দিবসকে সামনে রেখে রাজধানীর নয়াপল্টনে ব্যাপক শ্রমিক সমাবেশের প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপির সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। দেশের সব শ্রেণির শ্রমিকদের কণ্ঠ তুলে ধরা ও দীর্ঘদিনের দাবি সরকারকে জানানোর উদ্দেশ্যে এই সমাবেশ আয়োজন করা হচ্ছে। আয়োজকরা আশা করছেন, এতে লাখো শ্রমিকের অংশগ্রহণ ঘটবে।
শুক্রবার (১ মে) দুপুর আড়াইটায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশটি শুরু হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ছাড়া বক্তব্য রাখবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন।
সমাবেশ উপলক্ষে গত এক সপ্তাহ ধরে শ্রমিক দল ও বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো নানা প্রস্তুতিমূলক সভা ও কর্মসূচি পালন করছে। ইতোমধ্যে ব্যানার-ফেস্টুন, মঞ্চ নির্মাণ, জনসমাগম নিশ্চিতকরণসহ সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০ বাই ২৫ ফুটের একটি বড় মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখবেন।
শ্রমিক দলের নেতারা জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বন্দর, রেল, সড়ক পরিবহন, পাট, সুতা, গার্মেন্টস, ঔষধ কারখানা, রিকশা, ভ্যান ও পরিবহন খাতসহ সব শ্রেণির শ্রমিক ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা সমাবেশে অংশ নেবেন। সমাবেশে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শোভন কাজের পরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র ও শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবি তুলে ধরা হবে।
মঞ্চ নির্মাণের তদারকিতে থাকা জাতীয়তাবাদী প্রচার দলের সভাপতি মাহফুজ কবির মুক্তা বলেন, ‘মে দিবস উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাই মূল লক্ষ্য। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি শ্রমিকরা, তাদের ন্যায্য মজুরি ও উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।’
শ্রমিক দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘মহান মে দিবস উপলক্ষে একটি বৃহৎ শ্রমিক সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে ও এ লক্ষ্যে নেতা-কর্মীরা দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। গত ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে এবং একাধিক শ্রমিক সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে শিল্পকলা একাডেমিতে চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবারের সমাবেশে অংশগ্রহণের দিক থেকে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। আমরা আবারও প্রমাণ করতে চাই, শ্রমিক দলেরাই প্রকৃত অর্থে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর। সমাবেশ থেকে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া তুলে ধরা হবে ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কার্যকর দিকনির্দেশনা পাওয়ার আশা করছি। পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেও আমরা প্রত্যাশা করছি।’
সমাবেশে সাংস্কৃতিক আয়োজনও থাকছে। বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের সদস্য সচিব জাকির হোসেন রোকন জানান, মে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরতে সাংস্কৃতিক পর্ব অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং এ বিষয়ে প্রস্তুতি চলছে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘মে দিবস শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক প্রেরণার উৎস। শ্রমিকদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই এ দিবস যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের সমাবেশে বিপুল শ্রমিক সমাগম ঘটবে।
এদিকে নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন শেষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘এবারের মে দিবস একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে পালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় মজুরি কাঠামো ঘোষণা না হওয়া, আউটসোর্সিং নিয়োগ বৃদ্ধি, শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়া এবং শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি শ্রমজীবী মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আগে যেসব দাবি ছিল, সেগুলোর যেগুলো পূরণ হয়নি, সবই এবারও আমাদের দাবি হিসেবে থাকবে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি থেকে আমরা সরে যাব না। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শোভন কাজের পরিবেশ, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র এবং রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হবে এই সমাবেশ থেকে।’
দলীয় সূত্রে জানা যায়, সমাবেশ সফল করতে নিরাপত্তা, পরিবহন, মঞ্চ প্রস্তুতি ও জনসমাগম ব্যবস্থাপনায় একাধিক উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নেতারা আশা করছেন, ঢাকা মহানগরী ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক ও নেতাকর্মী এতে অংশ নেবেন।
অন্যদিকে, মহান মে দিবস ও জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর ও এ লক্ষ্যে মজুরি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে। তিনি নারী-পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। প্রবাসী শ্রমিকদের আর্থিক সুরক্ষা জোরদারে প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি। সুতরাং তাদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানতম অঙ্গীকার। শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষই যেকোনো দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি আর অগ্রযাত্রার প্রধান অবলম্বন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত নীতি ও সংস্কার শ্রমিক কল্যাণের ভিতকে শক্তিশালী করেছে। বিদেশে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে, শ্রমবাজার তৈরি করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সেই প্রবাসী শ্রমিকরা বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক রয়েছে পোশাক শিল্পে। এই শিল্পে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান অবিস্মরণীয়। পোশাক শ্রমিকদের কল্যাণে দেশ আজ ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, ১৮৯০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী শ্রমিক সংহতির প্রতীক হিসেবে ১ মে ‘মে দিবস’ পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মোট ৩৯টি কনভেনশন ও একটি প্রোটোকলে অনুস্বাক্ষর করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সঙ্গে নিবিড় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার বদ্ধপরিকর। বর্তমান সরকার শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই লক্ষ্যেই বিগত ঈদুল ফিতরে দেশের সব শ্রমিকের বেতন, বোনাস ও অন্যান্য সুবিধাদি সময়মতো পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বর্তমান সরকার। ভবিষ্যতেও একইধারা অব্যাহত রাখতে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সচেষ্ট।’