নকআউট পর্বে একের পর এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দে, মিশর কিংবা সুইজারল্যান্ড—প্রতিটি দলই আলবিসেলেস্তেদের যথেষ্ট ভুগিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিবারই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখেছে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। সেমিফাইনালেও তার ব্যতিক্রম হলো না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের জাদুতে ২-১ গোলের জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা।
অন্যদিকে ৬০ বছর পর ফাইনালে ওঠার ইংল্যান্ডের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো। ১৯ জুলাই শিরোপার লড়াইয়ে স্পেনের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা।
আটলান্টায় সেমিফাইনালের প্রথমার্ধ ছিল বেশ নিষ্প্রভ। দুই দলের কেউই লক্ষ্যে শট নিতে পারেনি। আক্রমণ তৈরির চেষ্টা থাকলেও শেষ তৃতীয়াংশে গিয়ে বারবার থেমে যায় উভয় দল। ফলে গোলশূন্যভাবেই বিরতিতে যায় ম্যাচ।
প্রথম ৪৫ মিনিটে মূলত শারীরিক লড়াইই বেশি দেখা গেছে। হাইড্রেশন ব্রেকের আগেই দুই দল মিলে ১১টি ফাউল করে। বিরতির আগে মোট ফাউলের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯-এ—আর্জেন্টিনার ১২টি, ইংল্যান্ডের ৭টি। তবে রেফারি ইসমাইল কার্ড ব্যবহারে ছিলেন যথেষ্ট সংযত। দুই দলের একজন করে খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখান তিনি।
বল দখলে অবশ্য এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। প্রথমার্ধে ৫৮ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে তারা। তবে লিওনেল মেসিকে এ সময় খুব একটা স্বাভাবিক ছন্দে দেখা যায়নি। তার একটি ফ্রি-কিক পাঞ্চ করে কর্নারে পাঠান পিকফোর্ড। পরে কর্নার থেকেও মেসির নেওয়া শট কাজে লাগেনি, কারণ এনজো ফার্নান্দেজ গোলরক্ষককে ফাউল করেছিলেন।
৩৩ মিনিটে বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি-কিক পায় ইংল্যান্ড। ডেক্লান রাইসের বল থেকে জন স্টোনসের হেড সাইড নেটে লাগে। দুই মিনিট পর মেসিকে থামাতে গিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন এলিয়ট অ্যান্ডারসন।
৩৯ মিনিটে আবারও সুযোগ তৈরি হয় আর্জেন্টিনার। মেসির পাস থেকে পাওয়া বলে জোরালো শট নেন এনজো ফার্নান্দেজ। তবে তার শট অল্পের জন্য গোলবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। এরপর রজার্সকে পেছন থেকে টেনে ধরায় হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। তিন মিনিটের যোগ করা সময়েও গোলের দেখা পায়নি কোনো দল।
বিরতির পর অবশ্য ম্যাচের চেহারা বদলে যায়। শুরুতেই আর্জেন্টিনার আক্রমণ থেকে বড় সুযোগ তৈরি হয়। গোলরক্ষকের লম্বা পাস ধরে ডান দিক দিয়ে বক্সে ঢুকে মেসি ও আলভারেজের দারুণ সমন্বয়। আলভারেজের জোরালো শট দুর্দান্তভাবে ঠেকান পিকফোর্ড। ফিরতি বল জালের বাইরের অংশে লাগে। পরে রেফারি কর্নারের সংকেত দেন।
এরপর আচমকাই এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। ডান দিক দিয়ে দ্রুত আক্রমণ গড়ে ওঠে তাদের। কেইন নিচে নেমে রজার্সকে বল দেওয়ার চেষ্টা করেন। লিসান্দ্রো মার্টিনেজ অ্যাক্রোব্যাটিক ভঙ্গিতে বল ক্লিয়ার করলেও সেটি আবার ইংল্যান্ডের দখলে যায়। রাইসের নিখুঁত ক্রসে ব্যাকপোস্টে থাকা অ্যান্থনি গর্ডন মলিনার পেছন থেকে বল কেড়ে নিয়ে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন। ইংল্যান্ড ১-০ গোলে এগিয়ে যায়।
গোল হজমের পর থেকেই আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধার বাড়তে থাকে। ৬৪ মিনিটে পারেদেসের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন গঞ্জালেজ। নেমেই আক্রমণে প্রভাব ফেলেন তিনি। এক মিনিট পর ডান দিক থেকে আসা লম্বা বলে হেড করলেও ইংল্যান্ডের রক্ষণ বিপদ সামলে নেয়।
৬৯ মিনিটে মেসির ক্রস থেকে গঞ্জালেজের আরও একটি দুর্দান্ত হেড আসে। এবারও আর্জেন্টিনার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান পিকফোর্ড। নিচু ডাইভে অসাধারণ সেভ করে দলকে রক্ষা করেন তিনি।
৭২ মিনিটে একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন করেন স্কালোনি। সিমিওনে, মলিনা ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে তুলে মাঠে নামান দে পল, মোন্তিয়েল ও ওতামেন্দিকে।
চার মিনিট পর দে পলের বাড়ানো ক্রস থেকে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসে। পরের মিনিটে গঞ্জালেজের হেডও গোলবারের পাশ দিয়ে চলে যায়। যদিও লাইন্সম্যান তখন অফসাইডের পতাকা তুলেছিলেন।
৮৪ মিনিটে এনজোর শট গোলপোস্টের ওপর দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেন পিকফোর্ড। কিন্তু এক মিনিট পরই আর রক্ষা হয়নি ইংল্যান্ডের। কর্নার থেকে মেসির বাড়ানো বলে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে শট নেন এনজো ফার্নান্দেজ। বল পিকফোর্ডের নাগালের বাইরে দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। ম্যাচে সমতা ফেরায় আর্জেন্টিনা।
এরপরও থামেনি আলবিসেলেস্তেদের চাপ। ম্যাচের ইনজুরি সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের গোলে পুরোপুরি উল্টে যায় ম্যাচের চিত্র। ৯২ মিনিটে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি ইংল্যান্ড। ৬০ বছর পর ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামা ইংলিশদের হতাশ করে ২-১ গোলের জয় নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেয় বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।