পর্বতারোহীরা কত না উদ্দেশ্যে নিয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টে উঠেন। কিন্তু ফিলিস্তিনি মধ্যবয়সী মোস্তফা সালামেহর উদ্দেশ্যটা একেবারেই ভিন্ন। তিনি এভারেস্টের পথে হাঁটছেন ফিলিস্তিনিদের স্বপ্ন নিয়ে। তার পিঠে শুধু অক্সিজেন সিলিন্ডার, রশি আর ভারী সরঞ্জামই নয়; আছে গাজার শিশুদের হাতে লেখা ছোট ছোট স্বপ্ন, কান্না আর অসমাপ্ত জীবনের না গল্প লেখা চিঠি।
৫৬ বছর বয়সী মোস্তফার লক্ষ্য শুধু পাহাড় জয় নয়; গাজার শিশুদের জন্য এক কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহ করা ও যুদ্ধের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের কণ্ঠ পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা। মোস্তফা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন একটি ঘুড়ি। সেই ঘুড়িতে লেখা রয়েছে গাজার শিশুদের কতো না স্বপ্ন। কেউ লিখেছে বড় হয়ে সে ডাক্তার হতে চায়। কেউ হতে চায় লেখক। কেউ পুলিশ কর্মকর্তা হতে চায়। আবার কেউবা লিখেছে, একদিন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গাজা পুনর্গঠন করবে সে।
কিন্তু সব শিশুর স্বপ্ন এত সাধারণ নয়। যেমন একটি শিশুর লেখা, সে শুধু তার বাবা-মায়ের সঙ্গে জান্নাতে দেখা করতে চায়। আরেক কিশোরী মুনিরা লিখেছে একটি সংখ্যা, ‘৪৭’। এই সংখ্যাটিই তার হারিয়ে ফেলা পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা। যুদ্ধ তাকে বাবা, মা, ভাই, বোন, দাদি, খালা, একসঙ্গে অনেক আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।
মোস্তাফা সালামেহ বলেন, ‘এই স্বপ্নগুলো হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়। শিশুরা সাধারণ কোনো স্বপ্ন লিখছে না। তারা বেঁচে থাকার আকুতি লিখছে।’
মোস্তফা এর আগে তিনবার এভারেস্টে উঠেছেন। বিশ্বের সাতটি মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গও জয় করেছেন। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতেও গেছেন। কিন্তু এবারের অভিযানের অনুভূতি একেবারেই আলাদা। কারণ এই যাত্রা তার কাছে ব্যক্তিগতও।
ফিলিস্তিনি শরণার্থী পরিবারে জন্ম নেওয়া মোস্তাফা ছোটবেলার বড় একটা সময় কাটিয়েছেন শরণার্থী শিবিরে। তিনি জন্মেছিলেন কুয়েতে, পরে বড় হয়েছেন জর্ডানের শরণার্থী ক্যাম্প আর আম্মানের ভেতর ঘুরে ঘুরে। উপসাগরীয় যুদ্ধের পর পরিবারসহ তাকে কুয়েত ছাড়তে হয়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি জর্ডানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তখন তার স্বপ্ন ছিল শুধু পড়াশোনা করা। পরে অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে স্কটল্যান্ডে পড়তে যান।
একসময় তিনি পাঁচতারকা হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু তার ভাষায়, সব বদলে যায় এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখার পর। তিনি স্বপ্নে দেখেন, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আজান দিচ্ছেন। এরপরই তার পাহাড়ের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। কখনো পর্বতারোহণ না করা সেই মানুষটিই কয়েক বছরের মধ্যে এভারেস্ট জয় করেন। গাজার যুদ্ধ তাকে আবার পাহাড়ে ফিরিয়ে এনেছে।
মোস্তফা বলেন, যুদ্ধের ভয়াবহতা, বিশেষ করে শিশুদের দুর্দশা তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি গাজায় গিয়ে মানুষদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, নিজের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা, অর্থাৎ পর্বতারোহণকে কাজে লাগাবেন তিনি।
এই অভিযানে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আল-খায়ের ফাউন্ডেশন। তাদের সহায়তায় গাজার মানুষের জন্য এক কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এভারেস্ট বেস ক্যাম্প থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোস্তাফা বলেন, পাহাড়ের এই কঠিন পরিবেশে শ্বাস নেওয়া, ঘুমানো, এমনকি খাওয়াও কঠিন। কিন্তু তার মতে, গাজার মানুষ প্রতিদিন যে বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে আছে, তার তুলনায় এই কষ্ট কিছুই না।
মোস্তফা বলেন, ‘আমরা এখানে ঠান্ডা, বাতাস আর উচ্চতার সঙ্গে লড়ছি। কিন্তু গাজার শিশুরা প্রতিদিন ভয়, ক্ষুধা আর মৃত্যু নিয়ে বাঁচছে, লড়ছে।’
গাজার যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ, মানবিক উদ্যোগ ও সংহতির নানা কর্মসূচি দেখা গেলেও মোস্তাফা সালামেহর এই উদ্যোগ আলাদা করে নজর কাড়ছে। কারণ তিনি শুধু অর্থ সংগ্রহ করছেন না; তিনি শিশুদের স্বপ্নকে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু চূড়ায় নিয়ে যেতে চাইছেন। যেন বিশ্ব তাদের কথা শুনতে বাধ্য হয়। যেমনটা একদিন তিনি পৃথিবীর সুউচ্চ চূড়ায় আজান দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
মোস্তফার স্বপ্নও এখন সেই শিশুদের মতোই একটিই, ‘একদিন ফিলিস্তিন স্বাধীন হবে।’
সূত্র: মিডল ইস্ট আই, আনাদুলু এজেন্সি এবং উইকিপিডিয়া