বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক ছিল শুধু দুই রাষ্ট্রনেতার কূটনৈতিক সাক্ষাৎ নয়; এটি ছিল এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চ, যেখানে করমর্দন, হাঁটার গতি, দাঁড়ানোর ভঙ্গি, চোখের ভাষা, সবকিছুই বহন করছিল শক্তির নীরব বার্তা। ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে দাঁড়ালেও, তাদের শরীরী ভাষা যেন বলছিল অন্য এক গল্প, বিশ্ব রাজনীতির পাল্টে যাওয়া ক্ষমতার ভারসাম্যের গল্প।
শুক্রবারই শেষ হয়ে গেল ট্রাম্পের তিনদিনের সফর। এখন আলোচিত এই সফর নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছে বিশ্বের থিংকট্যাঙ্কগুলো। বিশেষ করে এই সফরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ট্রাম্পের আচরণের পরিবর্তন। যে ট্রাম্পকে বিশ্ব বরাবর দেখেছে আত্মবিশ্বাসী, আগ্রাসী, কখনো কখনো অপমানজনক মাত্রায় আধিপত্য দেখাতে অভ্যস্ত একজন নেতা হিসেবে, বেইজিংয়ে সেই পরিচিত ট্রাম্পকে অনেকটাই অনুপস্থিত মনে হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্পের করমর্দন নিজেই একধরনের রাজনৈতিক প্রতীক। তিনি বহুবার বিভিন্ন নেতার হাত টেনে নিজের দিকে নিয়ে এসেছেন, কাঁধ চেপে ধরেছেন, ভারসাম্য নষ্ট করে প্রাধান্য দেখানোর চেষ্টা করেছেন। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে থেকে শুরু করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, ইউক্রেনের ভলোদিমির জেলেনস্কি—অনেকেই সেই বিখ্যাত ‘টানাহেঁচড়া করমর্দনের’ শিকার হয়েছেন, প্রাধান্যবিস্তারের শিকার হয়েছেন। কিন্তু বেইজিংয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সেই পরিচিত দৃশ্য একবারের জন্যও দেখা যায়নি। বরং পুরো করমর্দন ছিল হিসাবি, সংযত এবং অস্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রিত।
বিশ্লেষকদের মতে, এটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। এই সংকেত গোটা বিশ্বের জন্যই অন্য এক বার্তা বহন করছে।
‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প করমর্দন শুরু করলেও পুরো সময়টিতে তিনি অস্বাভাবিকভাবে সতর্ক ছিলেন। প্রায় দশ সেকেন্ডের দীর্ঘ করমর্দনে তার পরিচিত ঝাঁকুনি বা শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা দেখা যায়নি। বরং কয়েকবার হালকা চাপড়ে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছেন তিনি।
অন্যদিকে শি জিনপিং ছিলেন পুরোপুরি স্থির। অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
শি’র মুখভঙ্গি, দাঁড়িয়ে থাকার কায়দা, কাঁধের অবস্থান, সবকিছুতেই ছিল নিয়ন্ত্রিত আত্মবিশ্বাসের ছাপ। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিশেষজ্ঞদের মতে, করমর্দনের সময় শির হাতের অবস্থান সামান্য উঁচুতে ছিল, যা মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নিজের দিকে রাখার এক সূক্ষ্ম ইঙ্গিত। তিনি ট্রাম্পের মতো অতিরিক্ত আন্তরিকতা দেখানোর চেষ্টা করেননি, আবার দূরত্বও ভাঙেননি। যেন বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, এটি আবেগের সম্পর্ক নয়, বরং শক্তির হিসাব।
এই বৈঠকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট ছিল, ট্রাম্প আগের সফরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি নমনীয় ও সতর্ক ছিলেন।
২০১৭ সালে বেইজিং সফরে ট্রাম্পের আচরণে ছিল আত্মবিশ্বাসী আধিপত্যের প্রকাশ। তখন যুক্তরাষ্ট্র ছিল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে, আর চীন ছিল দ্রুত উত্থানশীল হলেও এখনও আমেরিকাকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার পর্যায়ে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতা ভিন্ন। এখন যেন চালকের আসনে চীন। আমেরিকা যেন তার প্যাসেঞ্জার।
এবার ট্রাম্প এমন এক সময়ে চীনে গেছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, ইরান যুদ্ধের অভিঘাত এবং বৈশ্বিক প্রভাব হ্রাসের সংকটে আছে। অন্যদিকে চীন নিজেকে এখন প্রকাশ্যেই বিশ্বের সমান্তরাল পরাশক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতা ট্রাম্পের আচরণেও প্রতিফলিত হয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস লিখেছে, এবারের সফরে ট্রাম্প মূলত সমঝোতার সুরে ছিলেন এবং তিনি প্রকাশ্যে শি জিনপিংকে ‘চমৎকার মানুষ’ ও ‘বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেন। এমনকি শুল্কযুদ্ধ ও বাণিজ্য সংঘাতের পরও তিনি সম্পর্কের উত্তেজনাকে অনেকটাই কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য ছিল না; বরং প্রয়োজনের বাস্তবতা।
কারণ এবার ট্রাম্প বেইজিংয়ে গিয়েছেন কিছু চাইতে—বাণিজ্য সমঝোতা, বিরল খনিজ রপ্তানি অব্যাহত রাখা, ইরান প্রশ্নে সহযোগিতা, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়েও যোগাযোগ স্থাপন করতে। অর্থাৎ আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো একতরফা প্রভাব বিস্তারকারী অবস্থানে ছিল না।
এই পরিবর্তন শি জিনপিংও খুব সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় আয়োজনে পুরো সফরজুড়ে ছিল সাম্রাজ্যিক আভিজাত্যের প্রদর্শন, লাল গালিচা, সামরিক অভ্যর্থনা, বিশাল হলরুম, কড়াকড়ি নিরাপত্তা এবং নিখুঁত প্রটোকল। কিন্তু এসব আয়োজনের ভেতরেও ছিল এক নীরব রাজনৈতিক বার্তা: চীন এখন আর উদীয়মান শক্তি নয়; বরং সমকক্ষ শক্তি।
ওয়াশিংটন পোস্টের ভাষায়, পুরো আয়োজনটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে বিশ্বের দুই সমমর্যাদার কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে দেখা যায়। আর সেই মঞ্চে ট্রাম্পকে আগের মতো উদ্ধত বা নিয়ন্ত্রণকারী মনে হয়নি। বরং অনেক মুহূর্তে তাকে প্রতিক্রিয়াশীল মনে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও লক্ষ্য করেছেন, ট্রাম্প পুরো সফরে অনেক বেশি স্ক্রিপ্টেড ও সংযত ছিলেন। গণমাধ্যমের সামনে তাৎক্ষণিক বিস্ফোরক মন্তব্য, নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি বা প্রকাশ্য আধিপত্যের চেষ্টা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এমনকি তাইওয়ান প্রশ্নেও তিনি দৃশ্যত সতর্ক থেকেছেন।
এই পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা।
একসময় ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতি ছিল চাপ প্রয়োগের ভাষা। কিন্তু এখন সেই ভাষার জায়গায় ক্রমশ দরকষাকষির বাস্তবতা চলে এসেছে। চীনও আর আগের মতো প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেই। বরং শি জিনপিং এমন এক নেতার ইমেজ তৈরি করেছেন, যিনি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে বিশ্বাসী, আবেগ নয় ধৈর্য দিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করেন। বেইজিংয়ের এই বৈঠকে সেই পার্থক্য খুব স্পষ্ট ছিল।
ট্রাম্প ছিলেন বেশি মানবিক, বেশি নরম, কখনো কখনো ক্লান্তও। আর শি ছিলেন যান্ত্রিকভাবে স্থির, ধীর এবং নিয়ন্ত্রিত।
অনেক বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিশেষজ্ঞ বলছেন, এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘কে কী বলেছে’ তার চেয়ে ‘কে কীভাবে দাঁড়িয়েছে’ সেটি। কারণ বড় শক্তিগুলোর সম্পর্কের ভবিষ্যৎ প্রায়ই প্রকাশ পায় এমন সূক্ষ্ম আচরণে।
হয়তো সে কারণেই বেইজিংয়ের এই করমর্দনকে অনেকে কেবল দুই নেতার কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখছেন না; বরং দেখছেন বদলে যাওয়া বিশ্বরাজনীতির এক নীরব প্রতীক হিসেবে। আমেরিকা এখনও শক্তিধর মানতেই হবে, কিন্তু তারা এখন আর একচ্ছত্র আধিপত্যের নিশ্চিন্ত উচ্চতায় নেই। আর চীন শুধু উত্থানশীল শক্তি নয়, বরং আত্মবিশ্বাসী বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেছে। তাই ট্রাম্পের এই চীন সফর কেবল আরেকটি রাষ্ট্রীয় সফরের তারিখ নয়; বরং ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে শক্তির নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্যের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের ইতিহাস হয়ে থাকার ইঙ্গিত দিল।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, দ্য ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস, দ্য লসএঞ্জেলেস টাইমস