বিতর্কের কেন্দ্রে থাকতেই পছন্দ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে এলেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত এক সপ্তাহেই তিনি অন্তত ২৮টি ভুল, বিভ্রান্তিকর বা ভিত্তিহীন তথ্য প্রকাশ্যে বলেছেন। অর্থনীতি থেকে শুরু করে নির্বাচন, অভিবাসন, ইরান যুদ্ধ—প্রায় সব বড় ইস্যুতেই ট্রাম্পের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের বড় ফারাক পাওয়া গেছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, ট্রাম্প কি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছেন, নাকি এটি এখন তার রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে গেছে?
সিএনএনের তথ্য যাচাই (ফ্যাক্টচেক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এসে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন। অথচ সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতির হার ছিল প্রায় তিন শতাংশের কাছাকাছি, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তো নয়ই, বরং তুলনামূলকভাবে মাঝারি পর্যায়ের। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন তার সময়ে মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু বাস্তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির হার আবারও বেড়েছে।
ট্রাম্পের সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত বক্তব্যগুলোর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে। তিনি আবারও দাবি করেন, দেশটির নির্বাচন ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি আসলে জিতেছিলেন। এমনকি তিনি বলেছেন, ‘আমরা তিনবার জিতেছি।’ অথচ যুক্তরাষ্ট্রের আদালত, নির্বাচন কমিশন ও একাধিক স্বাধীন তদন্ত বহু আগেই নিশ্চিত করেছে যে ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেন বৈধভাবেই জয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচন জালিয়াতির বড় কোনো প্রমাণও কখনো পাওয়া যায়নি।
ক্যালিফোর্নিয়া নিয়েও ট্রাম্প একটি অদ্ভুত দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘যদি যিশু খ্রিস্ট নেমে এসে ভোট গুনতেন, তাহলেও আমি ক্যালিফোর্নিয়ায় জিততাম।’ সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যালিফোর্নিয়া বহু বছর ধরেই ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি এবং ট্রাম্প সেখানে প্রতিবারই বিশাল ব্যবধানে হেরেছেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে এবং ইরানের প্রায় সব সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরানের সামরিক শক্তি বড় ধাক্কা খেলেও পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। বরং সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরান দ্রুত তাদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
অভিবাসন ইস্যুতেও ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। তিনি দাবি করেন, তার শাসনামলে একজন অবৈধ অভিবাসীও যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে পারেনি। কিন্তু সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত দিয়ে এখনো কিছু মানুষ নজর এড়িয়ে ঢুকছে, যদিও আগের তুলনায় সংখ্যা কমেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক শক্তির বড় অংশই তৈরি হয়েছে আবেগ, ভয় ও বিভাজনের রাজনীতির ওপর। তিনি প্রায়ই এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যা তার সমর্থকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অনেক সময় তথ্য সঠিক কিনা, সেটির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বক্তব্যটি রাজনৈতিকভাবে কতটা প্রভাব ফেলছে। সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প এখন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেছেন, যেখানে তথ্যের চেয়ে বিশ্বাস বড় হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো বহু বছর ধরেই ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে নিয়মিত তথ্য যাচাই করছে। এর আগেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তিনি হাজার হাজার বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা দাবি করেছিলেন। তবে ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন, মূলধারার সংবাদমাধ্যম তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ট্রাম্প আবারও তথ্য বনাম আবেগের রাজনীতিকে সামনে আনছেন। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ ও নির্বাচন ইস্যুতে তিনি তার সমর্থকদের একত্র রাখতে আক্রমণাত্মক বক্তব্য ব্যবহার করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এতে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে বলেও মনে করছেন অনেকে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন, ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে অতিরঞ্জিত বক্তব্য দেন, যাতে সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ ধরে রাখা যায়। আবার তার সমর্থকদের দাবি, সত্য বললেই তাকে মিথ্যাবাদী বলা হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখন সত্য-মিথ্যার লড়াইটাও অনেকটাই দলীয় অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।