বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং এক টেবিলে বসেছেন! শুধু তাই নয়, তারা দুজন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীও। এদের একজন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, অন্যজন চীনের সর্বময় ক্ষমতাধর নেতা। ইরান যুদ্ধের আবহে বিশ্ব এখন টালমাটাল। এ নিয়ে মন কষাকষি আছে দুই নেতার। এমন অবস্থায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই বিশ্বনেতার এক টেবিলে বসার দৃশ্য কল্পনা করুন, হ্যাঁ, অবিশ্বাস্যই বটে। বুধবার (১৩ মে) এমন একটি দৃশ্যই দেখবে বিশ্ববাসী।
দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে গেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাকে বহরকারী বিমানটি বুধবারই বেইজিংয়ে পৌঁছায়। ট্রাম্পের এই সফরে সঙ্গী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বড় টেক কোম্পানিগুলোর বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা জায়গা পেয়েছেন।
সেই তালিকায় অ্যাপলের শীর্ষ কর্মকর্তা টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্ক এবং ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্ক রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
এছাড়া মেটার ভাইস চেয়ারম্যান ডিনা পাওয়েল ম্যাককর্মিক, ভিসার প্রধান নির্বাহী রায়ান ম্যাকলনার্নি, বোয়িংয়ের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কেলি ওর্টবার্গ, ব্ল্যাকস্টোনের প্রধান নির্বাহী স্টিফেন শোয়ার্জম্যান, কার্গিলের প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যান ব্রায়ান সাইকসসহ আরও বেশ কিছু মার্কিন কোম্পানির উচ্চপদস্ত কর্মকর্তারাও যাচ্ছেন।
সফর পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত হোয়াইট হাউসের এমন এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, সবমিলিয়ে ট্রাম্পের এই সফরে ডজনেরও বেশি মার্কিন টেক কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্তকর্তারা থাকছেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোর জন্য বড় আয়োজন করছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্মানে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বিশেষ ভোজসভার।
চীনের শীর্ষ নেতা বিশেষ এসব আয়োজনের মাধ্যমে ট্রাম্পকে সমাদর ও আপ্যায়ন করবেন, তখন মাকিন এই প্রেসিডেন্টের নিশ্চয়ই ২০১৭ সালের স্মৃতি মনে পড়বে। শেষবার ওইবছর তিনি চীন সফরে এসেছিলেন। সেই সময়েও তার সম্মানে নানান আয়োজন ও বিশেষ আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
এমনকি চীনের যে শহরে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ, সেখানে নৈশভোজের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যা ট্রাম্পের আগে মার্কিন আর কোনো প্রেসিডেন্ট সম্মানে করা হয়নি।
কয়েক বছর ধরেই বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, তাইওয়ান ইস্যু, দক্ষিণ চীন সাগর এবং সামরিক উত্তেজনা ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। কিন্তু এখন আবার দুই পক্ষই এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত সমঝোতার পথে হাঁটতে চাইছে। আর সেই কারণেই ট্রাম্পের সম্ভাব্য বেইজিং সফর এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধুমাত্র একটি কূটনৈতিক সফর নয়; বরং দুই সুপারপাওয়ারের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা নির্ধারণের চেষ্টা। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক এখন এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সরাসরি সংঘাতে গেলে ক্ষতি হবে দুই দেশেরই, আবার পুরোপুরি বন্ধুত্বও সম্ভব নয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প মূলত চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজাতে চাচ্ছেন। তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে ফেলা, মার্কিন শিল্পকে শক্তিশালী করা এবং চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ব্যবহার করে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা লুফে নিয়েছে, কিন্তু একইভাবে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে সেভাবে সুযোগ দেয়নি।
এসব কারণে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও চীনা পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিচ্ছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি, সোলার প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত চিপ প্রযুক্তিতে চীনের অগ্রযাত্রা এখন ওয়াশিংটনের বড় উদ্বেগ। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, আগামী বিশ্বের অর্থনীতি ও সামরিক শক্তির বড় অংশ নির্ভর করবে এই প্রযুক্তিগুলোর ওপর। তাই চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন ট্রাম্পের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য।
অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের লক্ষ্য কিছুটা ভিন্ন। চীন এখন দীর্ঘ অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে রিয়েল এস্টেট খাতের সংকট, তরুণদের বেকারত্ব, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন খাতে ধীরগতির কারণে বেইজিংয়ের ওপর চাপ বাড়ছে। এই অবস্থায় চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরোপুরি সংঘাত চায় না। বরং তারা এমন একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক চায়, যাতে অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শি জিনপিং এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে। তিনি জানেন, চীনের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে বৈশ্বিক বাজারের দরজা খোলা রাখতে হবে। আর সে কারণেই বেইজিং চায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে অন্তত এমন একটি সম্পর্ক বজায় থাকুক, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সরাসরি সংঘাত হবে না।
তবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় রয়ে গেছে তাইওয়ান। যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলছে, তাইওয়ানের নিরাপত্তা রক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যদিকে চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দেখে এবং যেকোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানের কথা জানিয়ে আসছে। গত কয়েক বছরে তাইওয়ান প্রণালীতে চীনা যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজের তৎপরতা বেড়েছে। পাল্টা সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিও জোরদার হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প ও শি দুজনই জানেন, তাইওয়ান ইস্যুতে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তা শুধু এশিয়া নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে ভয়াবহ সংকটে ফেলবে। তাই দুই পক্ষই অন্তত সংকট ব্যবস্থাপনার একটা কাঠামো তৈরি করতে চাইছে।
এর বাইরে ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও এই বৈঠকের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করছে, চীন সরাসরি অস্ত্র না দিলেও রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সহায়তা করছে। অন্যদিকে চীন নিজেকে নিরপেক্ষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানও এই সফরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে তিনি নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, যিনি চীনের সঙ্গে কঠোর অবস্থান নিতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে আলোচনার টেবিলেও বসতে পারেন। তার সমর্থকদের বড় একটি অংশ মনে করে, ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি প্রকাশ্যে চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি যুদ্ধ শুরু করেছিলেন।
তবে সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্পের নীতিতে এক ধরনের দ্বৈততা আছে। একদিকে তিনি চীনের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলেন, অন্যদিকে আবার ব্যক্তিগত কূটনীতির মাধ্যমে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কও বজায় রাখতে চান। ফলে বেইজিং সফরটি অনেকটা রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে।
চীনের পক্ষ থেকেও এই বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ বেইজিং চায় বিশ্বকে দেখাতে যে, পশ্চিমা চাপ সত্ত্বেও চীন এখনো বৈশ্বিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার ধারণাটিও বদলাতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এখনকার যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নতুন শীতল যুদ্ধের মতো হলেও এটি পুরোনো সোভিয়েত-আমেরিকা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো একমুখী নয়। কারণ দুই দেশের অর্থনীতি গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। চীনের কারখানা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, দুইটিই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে শত্রুতা থাকলেও পুরো বিচ্ছেদ বাস্তবসম্মত নয়।
এই কারণেই ট্রাম্প-শি বৈঠককে অনেকে সংঘাত ঠেকানোর কূটনীতি বলছেন। দুই দেশই প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু একই সঙ্গে তারা জানে, একটি ভুল সিদ্ধান্ত গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে দিতে পারে।
তাই বেইজিংয়ের এই সম্ভাব্য বৈঠক শুধু দুই নেতার মুখোমুখি আলোচনা নয়; বরং এটি আগামী বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে যাবে, তারও একটি বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স ও বিবিসি