ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি বুধবার (২২ এপ্রিল) শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেটা এখনো বহাল রয়েছে। গত রাতে ট্রুথ সোশ্যালের একটি পোস্টে তেমনটাই জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লড়াইয়ের বদলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে এখন মূলত ‘অবরোধ যুদ্ধ’ চলছে, যেখানে দুই পক্ষই বাণিজ্যিক জাহাজ আটক ও জব্দে শক্তি প্রয়োগ করছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। অন্যদিকে শান্তি আলোচনার জন্য ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অপেক্ষায় ইসলামাবাদ। শহরের কিছু অংশ এখনো বন্ধ, কিছু সাইনবোর্ড টাঙানো আর আলোচনা হওয়ার জন্য খালি পড়ে থাকা হোটেলও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ফিরে আসার আশায় প্রস্তুত।
তবে কয়েক দিনের উত্তেজনাকর প্রতীক্ষার পর পরিবেশ বদলে গেছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে সাংবাদিকদের বিমানবন্দরের দিকে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে—এমন আলোচনা, কিংবা সপ্তাহের শুরুতে কাছাকাছি থাকা একটি সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণ করা বিশাল পরিবহন বিমান সি-১৭ গ্লোবমাস্টারের ভেতরের সম্ভাব্য সামগ্রী নিয়ে জল্পনা এখন আর নেই।
তার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রমাণ করার এবং চরম শত্রুদের মধ্যে যেকোনো ধরনের একটি সমঝোতা করানোর যে সুযোগ পাকিস্তানের সামনে ছিল, তা হয়তো আপাতত ইসলামাবাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে—এমন এক ধরনের হতাশাজনক উপলব্ধি এই মুহূর্তে কাজ করছে।
তবে পাকিস্তান হাল ছাড়েনি। বরং দুই পক্ষকে আলোচনায় বসাতে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন, পাকিস্তান ‘সংঘাতের আলোচনাভিত্তিক সমাধানের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।’
এদিকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই একটি সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনার কথা অন্তত একজন সাংবাদিককে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এটা বাস্তবতার প্রতিফলন নাকি একজন অধৈর্য লোকের কথা, যিনি আগামী সোমবার রাজা চার্লস তৃতীয়র রাষ্ট্রীয় সফরের আগে আর তার অল্প কিছুদিন পরই নিজের বহুল প্রতীক্ষিত চীন সফরের পূর্বে জরুরি কাজের তালিকা থেকে ইরানকে সরিয়ে দিতে উদ্বিগ্ন—তা বোঝা কঠিন।
তিনি তেহরানকে ‘ঐক্যবদ্ধ অবস্থান’ নেওয়ার জন্য সময় দিচ্ছেন—এমন ইঙ্গিত ইরানের প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে ক্ষতবিক্ষত এই শাসনব্যবস্থার যুদ্ধবিরতি ভেঙে দিয়ে আকাশপথে আরও হামলার ঝুঁকি নেওয়ার সম্ভাবনাও কম।
এদিকে স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইটে ইসলামাবাদে যাওয়ার বিষয়ে ইরানি প্রতিনিধিদলের অনীহা থেকেই বা কী বোঝা যাচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলে একে ওয়াশিংটনের ‘বিরোধপূর্ণ আচরণ’ বলে উল্লেখ করেছে ইরান। এক মুহূর্তে সর্বনাশা শাস্তির হুমকি দিয়ে পরের মুহূর্তে আপসের প্রস্তাবের পাশাপাশি ইতোমধ্যে ইরানের বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার দাবি তুলে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
ইরান এখনো অভিযোগ করছে, গত এক বছরে তারা যে দুইবার আলোচনায় বসেছিল, তার প্রতিবারই তাদের ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের পোস্টটি ছিল তার স্বাভাবিক জাঁকজমকপূর্ণ ভাষার তুলনায় অনেকটাই সংযত। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা ‘গুরুতরভাবে বিভক্ত, যা অপ্রত্যাশিত নয়’।
যে ব্যক্তি ইতোমধ্যে ইরানে শাসন পরিবর্তন ঘটিয়েছেন বলে দাবি করে আসছেন, তার এই বক্তব্য কি এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন আসলে বুঝতে হিমশিম খাচ্ছে তারা কাদের সঙ্গে কাজ করছে? ইরানের সঙ্গে কূটনীতি যেখানে কখনোই সহজ ছিল না, ‘শাসনব্যবস্থার ভাঙন’ কি তা আরও কঠিন করে তুলেছে?
ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা না হোক, পুরোনো নেতৃত্বের বড় অংশ সরে যাওয়ার পর এখন ইরানে আসলে কারা ক্ষমতায় আছে, সাম্প্রতিক সময়ে অভিজ্ঞ ইরান বিশ্লেষকদের মধ্যে জোরালোভাবে চলমান এই বিতর্কে নিজের এমন শব্দচয়নের মাধ্যমে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও যুক্ত হয়েছেন খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।