যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম রণতরি ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশটির ততোধিক ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনীর এই সিদ্ধান্ত ওই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৩ বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভূমধ্যসাগরে মার্কিন উপস্থিতি জোরদার করার লক্ষ্যে এই অত্যাধুনিক ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপটি সেখানে মোতায়েন করা হয়েছিল। এটি ফিরে যাওয়ার মানে এই নয় যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, বরং একে রণকৌশলের একটি পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এই রণতরি ফিরে যাওয়ার প্রধান কারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি: রণতরিটি তার নির্ধারিত মোতায়েনের সময়সীমা অতিক্রম করেছে এবং এর ক্রুদের দীর্ঘদিনের ক্লান্তি দূর করতে ও মেরামতের জন্য ভার্জিনিয়ার নরফোক নৌঘাঁটিতে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া রণতরীটিতে ছোট একটি দুর্ঘটনাও ঘটেছিল। তাতে এর কিছু ক্ষতি হয়েছে।
বৃহত্তম এই রণতরি ফিরে গেলেও ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি খুব একটা কমছে না। বর্তমানে লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হুমকি মোকাবিলায় এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তায় ‘ইউএসএস আইজেনহাওয়ার’সহ অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন মোতায়েন রয়েছে।
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার যুদ্ধটি বর্তমানে আরও দীর্ঘমেয়াদী এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক অপারেশনে রূপ নিচ্ছে। তাই বিশাল এই রণতরী মোতায়েন রাখার চেয়ে ছোট ও দ্রুতগতিসম্পন্ন ফোর্সের ওপর জোর দিচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনী।
ইরান এবং হুতি বিদ্রোহীদের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশল পুনর্নির্ধারণ করছে। রণতরীটির প্রস্থান মূলত একটি সামরিক রোটেশন বা পালাবদল, যুদ্ধের সমাপ্তির কোনো সংকেত নয়।
যুদ্ধ শেষ হয়নি; বরং বড় ধরনের সামরিক সাজসজ্জা সরিয়ে নিয়ে আমেরিকা এখন দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অবস্থানের দিকে নজর দিচ্ছে। আকাশপথে নজরদারি এবং অন্যান্য ছোট যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বজায় রাখছে।
তবে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড রণতরিটির এই পিছুটান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক আধিপত্যের জন্য একটি বড় ধরনের কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা। দীর্ঘ ৯ মাস সমুদ্রে কাটানোর পর এই যান্ত্রিক ও কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে জাহাজটির সরে যাওয়া প্রমাণ করে যে, অতি-উন্নত সামরিক প্রযুক্তিও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের তীব্র চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
আঞ্চলিক রাজনীতির বিচারে এই পিছুটান ইরান ও তার মিত্রদের কাছে একটি মনস্তাত্ত্বিক জয় হিসেবে গণ্য হতে পারে, বিশেষ করে যখন ইরানজুড়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের জবাবে তেহরান পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। শীর্ষ ইরানি নেতাদের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষের নিহতের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্য যখন উত্তপ্ত, তখন প্রধান রণতরীটির মেরামতের জন্য প্রথমে গ্রিসে চলে যাওয়া মার্কিন শক্তির অজেয় ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।